যুক্তিবাদী মানুষের জন্য ভাগ্য শব্দটি বা ভাগ্যের ধারণাটি সম্পূর্ণরূপে কাল্পনিক এবং হাস্যকর। এই শব্দটির সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই। প্রথমে আমরা একটু বোঝার চেষ্টা করি যে ভাগ্য শব্দটি দ্বারা আসলে কি বোঝানো হয়।
ভাগ্য বা কপালের লিখন, ইংরেজীতে বলা হয়, “Fate”। আদীম যুগ থেকেই মানুষ ভাগ্য নামক এক কাল্পনিক দর্শনে বিশ্বাস করে আসছে। ভাগ্য বলতে মূলত বোঝানো হয় যে, ভবিষ্যতে কার জীবনে কি ঘটবে, কার জীবন কেমন হবে, কার কখন মৃত্যু হবে, কিভাবে হবে সমস্ত কিছু আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে আছে। কোনো এক অলৌকিক খাতায় সবার ভাগ্যের পরিহাস লেখা আছে। ঠিক যেমনটি লেখা আছে, তেমনটিই ঘটবে। এ কারণে বলা হয়ে থাকে, “ভাগ্যের লিখন হয় না খন্ডন”।
মানুষের একটি চিরায়ত স্বভাব হচ্ছে, নিজের ব্যার্থতা স্বীকার না করা, নিজের ব্যার্থতার দ্বায়ভার অন্যের ওপর কিংবা ভাগ্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে সান্তনা দেয়া। কারণ বাস্তবতা মেনে নেয়া বেশ কঠিণ। কিন্তু নিজের ব্যার্থতা ভাগ্যের কিংবা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া সহজ। এতে ব্যার্থতার গ্লানি থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাওয়া যায়। মূলত এই ধারণা থেকেই “ভাগ্য” নামক শব্দটির জন্ম। প্রাচীন গ্রীক সভ্যতা থেকে শুরু করে সকল আব্রাহামিক ধর্মে ভাগ্যে বিশ্বাসের ব্যাপারটি লক্ষ্য করা যায়।
এখন আসি কেন ভাগ্যের ধারণাটি হাস্যকর এবং অযৌক্তিক। প্রথমে যদি ধরে নেই যে আমাদের সবার জীবনে কখন কি ঘটবে তার সবকিছুই আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে আছে। সেক্ষেত্রে, আমাদের কি আদৌ নিজ ইচ্ছা বা অনিচ্ছার কোনো দাম আছে? যদি সকল ইচ্ছা বা অনিচ্ছা পূর্বলিখিত ভাগ্যের ওপরই নির্ভরশীল হয়, তবে সেটা আমাদের নিজস্ব ইচ্ছা হলো কিভাবে? তাহলে তো আমরা প্রোগ্রাম করা রোবটে পরিণত হলাম। আমরাই তাই করছি যা আমাদের ভাগ্যে আগে থেকেই লেখা আছে। সেই লেখার বাহিরে আমরা একটি কাজ ও এদিক সেদিক করতে পারি না। আর যদি বলি যে না, আমাদের নিজের ইচ্ছা, অনিচ্ছার ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ আছে, তাহলে আর ভাগ্যের ধারণাটির কি কোনো যথার্ততা থাকলো? এই পুরো ব্যাপারটি একটি প্যারাডক্স। মানে আপনি যাই করুন না কেন, আপনি সফল হন বা ব্যার্থ হন দুই ক্ষেত্রেই এই ভাগ্যের গোজামিল দেয়া যায়।
ভাগ্যের ধারণাটি মূলত এসেছে ব্যার্থতা ঢাকবার জন্য এবং কাকতালীয় ঘটনার একটি সহজ ব্যাখ্যা দাড় করাবার জন্য। ধরুন অনেক সময় এমন অনেক অযাচিত ঘটনা ঘটে যার দ্বারা হয়তো আপনি লাভবান হয়েছেন তবে এর জন্য আপনি কোনো পরিশ্রম করেন নি। যেমন ধরুন, আপনি একটি লটারি জিতলেন। কিন্তু এই জেতার পেছনে আপনাকে কোনো প্রকার মেধা বা শ্রম প্রয়োগ করতে হয় নি। কাকতালীয় ভাবে আপনি বিজয়ী হয়েছেন। এক্ষেত্রে আপনি ব্যাখ্যা দিলেন যে আপনার ভাগ্যে এটা লেখা ছিলো। আবার যদি লটারি না জিততেন, সেক্ষেত্রেও আপনি বলতেন যে ভাগ্যে ছিলো না। সুতরাং, ফলাফল যেমনই হোক না কেন, আপনি ভাগ্য নামক কাল্পনিক ধারণাটি সেখানে বসিয়ে, হয় ভালো বোধ করবেন কিংবা নিজেকে সান্তনা দিবেন। নিজের আবেগকে বুঝ দেয়ার জন্য ভাগ্য ঢাল বা তরবারির মত ব্যাবহার করা যায়।
এখন আসি ভাগ্যে বিশ্বাস কেন ভয়ানক! ধরুন আমি একজন ভাগ্যে বিশ্বাসী ব্যাক্তি। তার মানে আমি জানি যে আমার দ্বারা কৃত সমস্ত কর্মকান্ড কোনো এক অলৌকিক সত্ত্বা দ্বারা পরিচালিত। সেটা আগে থেকেই লেখা আছে। এইটুক পড়ার পর অনেক ভাগ্যে বিশ্বাসী পাঠকই আবার দ্বিমত করে বলবেন যে না আমাদের নিজেদের কর্মকান্ডের ওপর আমাদের হাত আছে। কিন্তু ব্যাপারটা স্ববিরোধী এবং আজগুবি হয়ে গেলো না? আপনার ভাগ্যে আগে থেকেই সব লিখা আছে আবার আপনার নিজস্ব ইচ্ছার নিয়ন্ত্রণ ও আপনার আছে, দুটো একই সঙ্গে সত্য কিভাবে হয়? হয় আপনার নিজস্ব ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপর নিয়ন্ত্রণ আছে অথবা কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই সব ভাগ্যের লেখার ওপরই ঘটবে। যেকোনো একটা সত্য হতে পারে। যদি এমন হয় যে ভাগ্যে আগে থেকে কিছু একটা লেখা আছে কিন্তু সেটা আবার আমাদের কর্মের দ্বারা পরিবর্তন করা যায়, তাহলে আর সেই লিখিত ভাগ্যের মূল্য টা কি থাকলো? তাহলে তো এটাই প্রমাণিত হয় যে আমাদের কর্মই আমাদের ফলাফলের জন্য দায়ী। এখন আসি ভাগ্য কেন ভয়ঙ্কর! ভাগ্যে বিশ্বাসী একজন অপরাধী তার অপরাধকে বৈধতা দিতে পারে এই ভাগ্যকে দোষারোপ করে। যেহেতু তার ভাগ্যে এটা লেখা ছিলো যে উক্ত অপরাধটি সে করবে সেহেতু তার তেমন কিছু করার ছিলো না। একজন অপরাধীর জন্য, নিজেকে দোষ দিয়ে মানসিক যন্ত্রণা ভোগের চেয়ে ভাগ্যকে দোষ দিয়ে কিছুটা হলেও স্বস্তি পাওয়া যায়।
ভাগ্যে বিশ্বাস হয়তো আমাদের কিছুটা হলেও স্বস্তি দেয় তবে এর কোনো প্রমাণ বা যুক্তি নেই। আমরা আমাদের কর্মের ফলই ভোগ করি। যে যতবেশি পরিশ্রম করে সে তত ফলাফল পায়। আর যদি সে না পেয়ে অন্য কেও পায় তাহলে বোঝ উচিত যে অপরজন আরো বেশি পরিশ্রম করেছে বা কোনো না কোনো দিক দিয়ে তার চেয়ে এগিয়ে আছে।
ফুয়াদ হাসান
৪ এপ্রিল, ২০২৫
ঢাকা, বাংলাদেশ